ভূমিকা

 

কুয়াশা সিরিজ দিয়েই সেবা প্রকাশনীর যাত্রা শুরু। কিশোর-কিশোরীর প্রিয় কাহিনী রহস্য কাহিনী। শুধু বাংলাদেশ বলে নয়, পৃথিবীর সব দেশের জন্যই একথা সত্য। কিশোর-চিত্ত বিনোদনের জন্য ১৯৬৪ সালের জুন মাসে প্রকাশিত হলো কুয়াশা-১। এ বইয়ের জনপ্রিয়তা বাধ্য করেছে আমাদের এক-দুই করে একের পর এক বই প্রকাশ করে যেতে। আজ এতগুলো  বছর পর আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, কুয়াশা সিরিজ এদেশের কিশোর-কিশোরীদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। কিশোর মননের অবাধ কল্পনাশক্তির বিকাশে, নির্ভুল বাংলা ভাষা শিক্ষায়, সৌন্দর্যবোধ ও রুচির উন্নয়নে, ন্যায়-অন্যায়ের সঠিক ধারণা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কুয়াশা সিরিজের অবদান আজ সুশিক্ষিত অভিভাবকদের কাছে স্বীকৃত। তাঁরা জানেন, পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে অনেক সহজে অনেক দ্রুত অনেক বেশি শিখে নেয় ছেলে-মেয়েরা জমজমাট গল্প-কাহিনীর মধ্য দিয়ে, নিজেরই অজান্তে।

সিরিজের মূল চরিত্র — কুয়াশা, শহীদ ও কামাল। অন্যায়-অবিচারকে দমন করে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করাই এদের জীবনের ব্রত। এদের সঙ্গে পাঠকও অজানার পথে দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন; উপভোগ করবেন রহস্য, রোমাঞ্চ ও বিপদের স্বাদ। শুধু ছোটরাই নয়, ছোট-বড় সবাই যে এ বই থেকে প্রচুর আনন্দ আহরণ করতে পারবেন তাতে সন্দেহ নেই।

 

মাসুদ রানা এলো ১৯৬৬ সালের মে মাসে। অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করে বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন হলো। বাংলা সাহিত্যের জগতে প্রচণ্ড এক আলোড়ন সৃষ্টি  হলো ধ্বংস পাহাড়ের আগমনে। এক লাফে কয়েক ধাপ ডিঙিয়ে সু-সাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত হলো যেন বাংলা রোমাঞ্চ-উপন্যাস। কিশোর-কিশোরীদের বদলে এবার অগণিত প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক-পাঠিকার জন্যে এলো বড়দের প্রথম রোমাঞ্চ-উপন্যাস। স্পাই থ্রিলার। একবার যা পড়তে শুরু করলে শেষ না করে নামিয়ে রাখার উপায় নেই।

মাসুদ রানা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত,  দুঃসাহসী স্পাই। গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। কোথাও অন্যায় অবিচার অত্যচার দেখলে রুখে দাঁড়ায়। পদে পদে তার বিপদ শিহরণ ভয় ও মৃত্যুর হাতছানি।

এ বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল ঝড় উঠেছে আলোচনা-সমালোচনার। কেউ ভাল বললেন, কেউ মন্দ বললেন; কেউ কেউ বললেন — আমরা  সমসাময়িক মানুষ, ভাল বা মন্দ রায় দেয়ার অধিকার আমাদের নেই, তোমাদের কাজ তোমরা করে যাও, ভালমন্দের যাচাই হবে কালের কষ্টি পাথরে, বিচার করবে আগামী জেনারেশন।

আমরা এগিয়ে চলেছি। অসংখ্য বাধাবিঘ্ন ডিঙিয়ে একের পর এক প্রকাশ করে চলেছি মাসুদ রানার আশ্চর্য সব অকল্পনীয় কাহিনী। প্রতিটি কাহিনী এক, দুই বা তিন খণ্ডে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আজও নিরবচ্ছিন্ন বেরোচ্ছে মাসুদ রানার বই একের পর এক। এ পর্যন্ত লেখা হয়েছে ৪৬৪টি কাহিনী।

 

১৯৬৯ সালে শুরু হলো বিভিন্ন লেখকের লেখা গল্প-উপন্যাস — সেবা রহস্য সিরিজ। তারপর ১৯৭৪ সালে শুরু হলো আত্ম-উন্নয়ন সিরিজ। কেবলই বিনোদন বা মনোরঞ্জন নয়, আমরা বিদ্যুৎ মিত্রের আত্ম-উন্নয়ন ও শিক্ষামূলক কিছু বই পাঠক-পাঠিকাকে উপহার দিতে পেরে রীতিমত গর্বিত। উপকৃত পাঠক-পাঠিকার অসংখ্য প্রশংসা পত্র আমাদের একাধারে কৃতজ্ঞ ও উৎসাহিত করছে।

সিরিজ বহির্ভূত ৩০৬টি গল্প-উপন্যাস, ৩২০টি ক্লাসিক ও অনুবাদ বই প্রকাশ করেছি আমরা সিরিজের ফাঁকে ফাঁকে। এ ছাড়াও রয়েছে অনেকগুলো ছোট-গল্প সংকলন ও বিদেশের সেরা রহস্য-গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা শিকার ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এ প্রকাশনীতে যোগ করেছি নিত্য নতুন জনপ্রিয় বিষয়বস্তু। ১৯৮৩ সালে এসেছে বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম ওয়েস্টার্ন কাহিনী। আশাতীত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এ সিরিজ। আজ সে ওয়েস্টার্নের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ৩৬৪টি।

১৯৮৪-র জুলাই মাসে শুরু হয়েছে কিশোরদের জন্যে কিশোর ক্লাসিক সিরিজ। ইতোমধ্যেই একের পর এক ৩০৬টি বিশ্বখ্যাত ক্লাসিকের অনুবাদ প্রকাশ করেছি আমরা —  আরও করছি। এ ছাড়া ১৯৮৫ সাল  থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর তিন গোয়েন্দা সিরিজ রচনা করেন সুলেখক রকিব হাসান। এরপর তিনি অপারগতা প্রকাশ করায় ২০০৩ সালে সিরিজটির হাল ধরেন শামসুদ্দীন নওয়াব ছদ্মনামে কাজী শাহনূর হোসেন, কাজী মায়মুর হোসেন ও আরও কয়েকজন। অদ্যাবধি তাঁদের হাত ধরে চলছে জনপ্রিয় সিরিজটি। ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে সাড়ে পাঁচশ’রও বেশি কাহিনী। ১৯৮৫-র আগস্টে তিন গোয়েব্দার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য এসেছে আরও একটি চমকপ্রদ আকর্ষণ — কিশোর থ্রিলার’ সিরিজ।  আর ’৮৭-তে সেবা থেকে বের হয়েছে তরুণ পাঠকদের প্রিয় সেবা রোমান্টিক’।

 

১৯৭০ সালের নভেম্বরে সেবা প্রকাশনী থেকে আমরা প্রকাশ করেছিলাম মাসিক রহস্যপত্রিকা। মাত্র ৪টি সংখ্যা বের হয়েই সেটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। দীর্ঘ দিন পর দ্বিতীয় পর্যায়ে এর প্রকাশনা শুরু হয়েছে ১৯৮৪-র নভেম্বর মাসে। তারপর থেকে গত ৩৬ বছর নিয়মিত প্রকাশের পর মহামারী করোনার কারণে ৬ মাসের জন্য এসেছিল সাময়িক বাধা — শুরু হয়েছে আবার।

১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রজাপতি প্রকাশন নামে সেবা প্রকাশনীর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান থেকে সাদা কাগজে ছেপে এ পর্যন্ত আমরা নানান ধরনের ৩৩৩টি বই প্রকাশ করেছি

 

সবশেষে আর একটি প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। এই দীর্ঘ ৫৬টি বছর ধরে আমরা যত পাঠক-পাঠিকার ভালবাসা, সমর্থন, সাহায্য ও সহানুভূতি লাভ করেছি, এবং যাঁদের উৎসাহে একটা দুটো করে এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার বই প্রকাশের অনুপ্রেরণা লাভ করেছি — তাঁদের সবার কাছে আমি যার-পর-নাই কৃতজ্ঞ। আপনাদের সবার প্রতি আমার বিনম্র ধন্যবাদ। খোদা হাফেজ।

 

কাজী আনোয়ার হোসেন